
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিও, ছবি ও কণ্ঠস্বর আসল নাকি নকল; তা চেনা দিন দিন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। এই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করাই নয়, বরং আসল ও সত্য কনটেন্ট যে আসলেই নির্ভরযোগ্য তা প্রমাণ করাও সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দুবাই পুলিশের 'ফিউচার ফোরসাইট সেন্টার' পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এ বিষযে মারাত্মক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত বাড়তে থাকা ডিপফেক প্রযুক্তি কীভাবে জননিরাপত্তা, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, ডিজিটাল প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং তার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।
অক্টোবর মাসজুড়ে উদযাপিত সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা মাসের অংশ হিসেবে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 'সেফ ইউএই থ্রু ইউর ডিজিটাল অ্যাওয়ারনেস' শীর্ষক অভিযানের আওতায় এই গবেষণাটি করা হয়। দুবাই পুলিশ ও দুবাই ইলেকট্রনিক সিকিউরিটি সেন্টারের সহযোগিতায় পরিচালিত এই গবেষণায় ডিপফেক প্রযুক্তির উদীয়মান ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কীভাবে আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের জন্য প্রস্তুত হতে পারে, সে সম্পর্কে গভীর আলোচনা করা হয়েছে।
দুবাই পুলিশের ফিউচার ফোরসাইট সেন্টারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার ড. হামদান আহমাদ হামদান আল ঘাসিয়া জানান, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা জেনারেটিভ এআই-এর অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে মানুষের মুখমণ্ডল, কণ্ঠস্বর নকল করা এবং হুবহু বাস্তবসম্মত ভিডিও কিংবা অডিও তৈরি করা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে উঠেছে।
এসব সক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারকরা নিখুঁতভাবে পরিচয় চুরি, অন্য কারও ছদ্মবেশ ধারণ, জালিয়াতি, ডিজিটাল বিভ্রান্তি তৈরি এবং তথ্য বিকৃতি ঘটাতে পারে। এ পরিস্থিতি কেবল সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্যই চ্যালেঞ্জিং নয়, বরং নিরাপত্তা সংস্থা, ডিজিটাল যাচাইকারী সংস্থা এবং আদালতের তথ্য-প্রমাণ মূল্যায়নের কাজে যুক্ত পক্ষগুলোর জন্যও এক চরম পরীক্ষা এনে দিয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভুয়া জিনিস চেনার বাইরে গিয়েও সাধারণ মানুষ আদৌ অনলাইনে থাকা কোনো আসল বা সত্য তথ্যকে বিশ্বাস করবে কি না—তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল তথ্যের সত্যতা নিয়ে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের গ্লোবাল রিস্কস রিপোর্ট ২০২৬ অনুসারে, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে যাওয়া শীর্ষ ঝুঁকিগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ছড়াছড়ি। ড. আল ঘাসিয়া মন্তব্য করেন, আন্তর্জাতিক এই সমীক্ষাই প্রমাণ করে যে ডিজিটাল তথ্য পরিবেশের সততা রক্ষা করা এখন কতটা কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে এআই-এর সহজলভ্যতার কারণে যখন যে কেউ খুব সহজেই বিভ্রান্তিকর প্রযুক্তি তৈরি করতে পারছে।
গবেষণার অন্যতম প্রধান অনুসিদ্ধান্ত হলো, ভবিষ্যৎ সাইবার নিরাপত্তার লড়াই শুধু ভুয়া ছবি বা ভিডিও শনাক্তকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডিপফেক প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, ততই এমনকি কোনো আসল ছবি, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডও অহেতুক সন্দেহ বা ডিজিটাল প্রমাণের অভাব সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়বে। এজন্যই গবেষণায় ডিজিটাল কনটেন্টের উৎস, এর খাঁটি রূপ ও সঠিকতা যাচাই করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে করে বিভ্রান্তিকর তথ্যের আক্রমণ থেকে সাধারণ মানুষ ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা যায়। কারণ, আসল তথ্যের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখাটা ভুয়া তথ্য চেনার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ডিপফেককে নিরাপত্তার জন্য একটি জোড়া বা দ্বিমুখী হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন ড. আল ঘাসিয়া। তিনি বলেন, একদিকে যেমন অপরাধীরা প্রতারণা, জালিয়াতি বা বিভ্রান্তি ছড়াতে ডিপফেক ব্যবহার করছে, অন্যদিকে এই প্রযুক্তির সূক্ষ্মতার কারণে বিভিন্ন তদন্ত বা নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তের সময় আসল ডিজিটাল প্রমাণের সত্যতা প্রমাণের বিষয়টিও জটিল হয়ে পড়ছে। অপরাধ নতুন রূপ নেওয়ার আগেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার এবং সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে এই গবেষণা। শুধু অপরাধ ঘটে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে প্রযুক্তিগত বিকাশ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্ক সংকেত চিহ্নিতকরণ, সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের পরিস্থিতি বিবেচনা করে কৌশল তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে এই ঝুঁকির পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার অপার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছে গবেষণাটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই ছবির পরিবর্তন, অডিও বা ভিডিওতে কৃত্রিম কারসাজির সূক্ষ্ম ছাপ অ্যানালিসিস করে ডিপফেক শনাক্ত করতে পারে। এ ছাড়া ডিজিটাল ফরেনসিক অ্যানালিসিস উন্নত করা এবং ডিজিটাল প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করার আধুনিক উপায় তৈরিতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যা নিরাপত্তা বাহিনীকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে।
অবশ্য শুধু আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে যে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, তাও স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি, নাগরিকদের ডিজিটাল যাচাইকরণের দক্ষতা বাড়ানো এবং ইন্টারনেটে কোনো তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঠিক সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে সাইবার হুমকির মুখোমুখি হয়েও জনআস্থা বজায় রাখা সম্ভব হয়।
ভবিষ্যতের ডিজিটাল বিশ্বকে নিরাপদ রাখার বার্তা দিয়ে ড. আল ঘাসিয়া জানান, দুবাই পুলিশের ফিউচার ফোরসাইট সেন্টারের বিশ্বব্যাপী উদ্ভূত প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশের কার্যক্রমে তার প্রভাব মূল্যায়নের যে কাজ চলছে, এটি তারই একটি অংশ। প্রযুক্তির পরিবর্তন আগে থেকে অনুমান করতে পারলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং উপযুক্ত কৌশল তৈরি করতে সক্ষম হবে। প্রযুক্তির কারসাজি ধরা তো বটেই, তবে মূল লক্ষ্য হলো খাঁটি ও সত্য তথ্যের প্রতি মানুষের যে আস্থা, তা ধরে রাখা; যা আধুনিক ডিজিটালাইজড সমাজকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সবচেয়ে জরুরি শর্ত।